চবি’র যাত্রী ছাউনিতে অযত্নে আর অনাহারে পড়ে থাকা বাহরাইন প্রবাসীর মায়ের গল্প

0
70
0 Shares

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে ১নং গেইট এলাকার চবি’র যাত্রী ছাউনিতে অযত্নে আর অনাহারে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে বাহরাইন প্রবাসী মোহাম্মদ ওসমানের মা আয়েশা বেগম (৭০)। প্রবাসীর মা আয়েশা বেগমের নিজ বাড়ী সাতকানিয়া বলে জানান তিনি তবে এর বেশি কিছু আর বলতে পারেননি। কিন্তু প্রবাসে থাকা আপন পুত্র ওসমানের কথা বলতে পেরেছে। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকতে থাকতে রোগসংক্রমণে কষ্ট পেয়ে স্মৃতিশক্তি অনেকটা হারিয়ে গেছে।

তিনি হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারা ইউনিয়নের জোড় পুকুরপাড় এলাকার পুঁটি বাপের বাড়ী নিবাসী মরহুম মোহাম্মদ নন্না মিঞার চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন, সেখানে সংসার করে শুধুমাত্র একটি ছেলে সন্তান জন্ম দেন, যার নাম রাখা হয়েছে মোহাম্মদ ওসমান। স্বামী নন্না মিঞার সহায়সম্পদ নাই বললেও চলে, একটি ঘর ছাড়া তার আর কোন সম্পদ নাই। তারপরও নন্না মিঞা বিয়ের আসরের আয়োজন কম করেননি, একে একে সাত সাতটি বিয়ে করেছেন। স্ত্রীর সংখ্যা বেশী হওয়ার কারণে স্বামীর ভিটেমাটিতে হইতো তার স্থান হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আয়েশা বেগম বেশ জেদি ও রাগি ছিলেন, ঘরে সবকিছু থাকার পরেও তিনি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মানুষের দোয়ারে দোয়ারে হাত পেতে থাকতেন, একসময় এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তবে তিনি বর্তমানে যেখানে অবস্থান করছেন সেখানকার জনসাধারণ ও স্থানীয় সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকরা জানান, মহিলা বিগত ৩মাস যাবৎ এই যাত্রী ছাউনিতে থাকছেন, প্রথম প্রথম কিছুদিন এলাকার মানুষের ঘরে গিয়ে খাবার চেয়ে খাইতেন, এখন আর খাবারের সন্ধানে কোথাও যায়না।

কেউ দিলে খায় আর না দিলে খিধার যন্ত্রণা সহ্য করে অনাহারে পড়ে থাকেন। রমজান মাসে সিএনজি চালকরা সবাই তার খোঁজখবর নিতেন, এখন আর আগের মতো নেওয়া হয় না। তবে ফোরকান নামের এক সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক দুপুরবেলা খাবার আর রাত্রিবেলা মশার কোয়েল দিয়ে যায় বলে জানাগেছে। আয়েশা বেগমের ছেলে ওসমান বড় হলে শখের বশে তাকে বিয়ে করান হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়ন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে,

ওই এলাকার জৈনিক ব্যক্তির মেয়ের সাথে বিয়ে হওয়ার এক সপ্তাহ পর ওসমান তার মাকে বউ এবং শাশুরির কাছে রেখে যান। সেখানে তার কিছুদিন যাওয়ার পর ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয়। পরে তাকে ছেলের পরামর্শ অনু যায়ী ১২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে আলাদাভাবে বাসা ঠিক করে দেন, সেখানে তিনি নিজেই রান্নাবান্না করে খাইতেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে তখন রান্নাবান্না করতে পারতেন না, ঠিক তখনই চবি’র বিভিন্ন হোটেলে খাবারের সন্ধানে বের হতেন। এছাড়া তিনি পার্শ্ববর্তী ভাড়াটিয়ার কাছ থেকেও অনেক সময় খাবার খেয়ে নিয়ে ছেন।

প্রতিবেশী সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময় অপ্রয়োজনীয় জিনিস বা খাবার এনে বাসায় জমাতেন এইভাবে জমাতে জমাতে এক সময় তার ঘর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে, এত করে পার্শ্ববর্তী ঘরে থাকা ভাড়াটিয়াদের বসবাস করা দুষ্কর হয়ে পড়েছিল, এভাবে পার হয়ে গেলো চারটে বছর, রোজার আগে তার ছেলে প্রবাসী ওসমান চার বছর পর দেশে আসার খবর পেয়ে গত রমযান মাসের আগে পুত্রবধূ ও বেয়াইন সহ প্রতিবেশী সবাই মিলে আয়েশা বেগমের ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দেন। একারণে রাগ করে ভাড়ার ঘর ছেড়ে চবি’র যাত্রী ছাউনিতে এসে থাকছেন তিনি।

এদিকে বিষয়টি অনুসন্ধান করে জানাগেছে ওসমানের শাশুড়ি ও তার স্ত্রীর কাছে ওসমানের মা বেশ কয়েকবার লাঞ্ছিত হয়েছে, বিয়ের এক সপ্তাহ পর স্ত্রীর কাছে মাকে রেখে যাওয়ার কারণে প্রতি মাসে বাসা ভাড়া ও খাবার খরচ পাঠাতেন ওসমান। তারপরও পুত্রবধূ অবহেলা করতেন। তাদের এমন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ঘর ছেড়ে বাহিরে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। তার স্বাস্থ্য বর্তমান ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে আয়েশা বেগম বলেন, আমার ছেলে বিদেশ থাকে, সে জানেনা দেশে আমার সাথে ঠিক কি কি ঘটনা ঘটছে। আমাকে ওসমানের বউ তিনটে লাথি মেরেছে। আমার ঘরের মালামাল তার সরিয়ে ফেলেছে,

তাই আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসছি। আমি মরলে রাস্তাঘাটে মরবো তারপরও আমি তাদের কাছে যাবনা।এ বিষয়ে বাহরাইন থেকে তার ছেলে ওসমান বলেন, আমি বিয়ে করে দেশে এক সপ্তাহও ছিলাম না, জরুরী কাজে চলে আসতে হয়েছে। আসার সময় আমার মাকে আমার স্ত্রী ও শাশুড়ির কাছে রেখে এসেছি। তাদের মধ্যে মত পার্থক্য হলে ঝগড়াঝাঁটি হয়। আমার মা ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার খবর আমি পেয়েছি, কিন্তু দেশে আমার মা’র কেউ নেই। তিনি নিজের বাড়ী সাতকানিয়াও চিনেনা। এদিকে আমি প্রবাসে প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকার লোক সান হয়েছে।

প্রতিবেদক ওসমানকে সবকিছু খুলে বলার পর ওসমান তার খালাত বোনকে পাঠিয়ে তার মাকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে এমনটা জানালেও দুইদিন অতিক্রম হয়ে যায়, কিন্তু কেউ আসেনি প্রবাসীর মাকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে। তারপরও প্রতিবেদক ওসমানের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে বারবার জানতে চেয়েছে তার মাকে নিতে কেউ আসছেন কিনা। বৃহস্পতিবার (১০ই জুন) বিকেল পর্যন্ত আয়েশা বেগম পড়ে আছে চবি’র যাত্রী ছাউনিতে।

মো. সাহাবুদ্দীন সাইফ

0 Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here