আল্লামা শাহ্ আহমদ শফির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জুনায়েদ বাবুনগরী

0
42

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অবস্থিত এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম (হাটহাজারী মাদ্রাসা)’র শিক্ষা পরিচালক ও কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’র আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবু নগরী লাখো মানুষের পরম শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হাটহাজারী মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির

আল্লামা শাহ্ আহমদ শফি (রহঃ) এর পাশে। বৃহস্পতিবার (১৯ই আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ নামাজে জানাযা শেষে রাত পৌনে ১২টায় তাকে দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার সাবেক মুহ তামিম ও সাবেক হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর কবরের পাশে দাফন করা হয়। পবিত্র কালেমা শাহাদতের উচ্চারণের ধ্বনিতে এ সময় করবস্থানে উপস্থিত তৌহিদি জনতা এবং মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা আজীবন সংগ্রামী এই সিপাহসালারকে বিদায় জানান।

জানাজা নামাজে অংশ নিতে গভীর রাতেও জনস্রোতে পরিণত হয় হাটহাজারী এলাকার সংযুক্ত মহাসড়ক গুলো। জানাজায় ইমামতি করেন হেফাজতে ইসলামের উপদেষ্টা থেকে আমির পদে সদ্য নিযুক্ত ও জুনায়েদ বাবুনগরীর সম্পর্কে মামা মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এতে সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালাম সহ স্থানীয় রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য লোকজন শরিক হন।

এ সময় মাদরাসা ময়দান ছাড়িয়ে মুসল্লির কাতার মাদরাসা সংলগ্ন হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক সহ আশ পাশের এলাকায় বিস্তৃত হয়। তার আগেই ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে জুনায়েদ বাবুনগরীর ইন্তেকালের পর তার জন্মস্থান চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাবুনগর গ্রামে তাকে দাফন করার অনুরোধ করেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। তবে হেফাজত নেতা ও মাদরাসার শিক্ষকরা তাকে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফির পাশেই দাফন করার পক্ষে মত দেন। এই উদ্দেশ্যে উভয় স্থানে চলে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি।

তবে বিষয়টি নিয়ে হেফাজতের শীর্ষ নেতা ও আলেম উলামাগণ দফায় দফায় বৈঠক করেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে তাকে হাটহাজারী মাদরাসা ক্যাম্পাসে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। গত ৮ই আগস্ট হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তিনি করোনা ভাইরাস কোভিড ১৯ এর ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন তিনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর বেসরকারি হাসপাতাল সিএসসিআর এ তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার আগে সকালে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স যুগে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়,

পরে সেখানে কিছুক্ষণের মধ্যে চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ কিডনী, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ সহ বিভিন্ন রোগে ভুগ ছিলেন। ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যুকালে তিনি আপন স্ত্রী, পাঁচ কন্যা, এক পুত্র সন্তান রেখে গেছেনে। প্রখ্যাত এই আলেমে দ্বীনের ইন্তেকালে চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। তাকে শেষবারের মতো দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সর্বস্তরের তৌহিদি জনতা হাটহাজারী মাদরাসায় ছুটে আসেন।

তাকে শেষ বিদায় জানাতে দল-মত নির্বিশেষে হেফাজতের নেতাকর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও হাটহাজারী মাদরাসায় আসেন। দেশের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ র আমির ও প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালের ৮ই অক্টোবর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাবুনগরে মোহাম্মদ আবুল হাসান ও ফাতেমা খাতুনের ঘরে বাবুনগরী জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি পাঁচ বছর বয়সে জমিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় ভর্তি হন।

সেখানে তিনি মক্তব, হেফজ ও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপর তিনি হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৭৬ সালে সেখান থেকে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি পাকিস্তান গিয়ে করাচিতে জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হন। দুই বছর হাদিস নিয়ে গবেষণা শেষে তিনি আরবি ভাষায় সীরাতুল ইমামিদ দারিমী ওয়াত তারিখ বি শায়খিহী শীর্ষক অভিসন্দর্ভ জমা দেন। সেখান থেকে তিনি হাদিসের সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন।

১৯৭৮ সালে দেশে ফিরে তিনি বাবুনগর মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। বাংলাদেশের মাদরাসা সমূহে সর্বপ্রথম বাবুনগর মাদরাসায় তিনি উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগ চালু করেন। এর পর ২০০৩ সালে তিনি হাটহাজারী মাদরাসায় যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি এ মাদরাসার শায়খুল হাদিস এবং শিক্ষা পরি চালকের দায়িত্ব পালন করেন। অপরদিকে ২০১৩ সালে তিনি হেফাজতে ইসলামের মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে গত ২০২০ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর ইন্তেকালের পর ১৫ই নভেম্বরের আমির পদে মনোনীত হন।

গত ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মুদির আগমন নিয়ে দেশব্যাপী হেফাজতের আন্দোলনের এরপর ২৫শে এপ্রিল নানা কারণে ওই কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি গত ৭ই জুন ৩৩ জনে উন্নীত হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

মো. সাহাবুদ্দীন সাইফ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here